নিজস্ব প্রতিবেদক | AdChannel24.com
প্রকাশের তারিখ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি
বিশ্ববাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের ব্যয় এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। সোমবার, ১৯ অক্টোবর, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা যায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের দাম কমলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্ক মনোভাব বজায় ছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের নিক্কেই সূচক ২ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারেও ১ দশমিক ৬ শতাংশ পতন হয়েছে। জাপানকে বাদ দিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোর এমএসসিআই সূচক ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ সুফল নিয়ে সংশয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের নজরে এসেছে। এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়াতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং অবকাঠামো, চিপ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। তবে এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বাজারে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিনিয়োগের সুফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়, ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি বন্ডের উচ্চ মুনাফার হার ও করপোরেট ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে এশিয়ার প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ, এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় অর্থনীতি সেমিকন্ডাক্টর, মেমোরি চিপ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এবং এআই অবকাঠামোর সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বিনিয়োগ কমায় বা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও শেয়ারের মূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারগুলোতে বড় ধরনের বিক্রির চাপ ছিল। এর প্রভাব এশিয়ার প্রযুক্তি খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। বাজারসংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি এখন বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আসন্ন ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফলের দিকে। এসব ফলাফল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা, ভবিষ্যৎ আয় এবং এআই খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে সোমবার দর কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ০৬ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়ায়। রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পর তেলের বাজারে এই পরিবর্তন দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বাজারের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বৈশ্বিক বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে উত্তেজনা বাড়লে তেলের সরবরাহ এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে তেলের দাম কমার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। সোমবারের লেনদেনের আগে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার সূচক ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নাসডাক ফিউচার সূচক ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ এশিয়ার বাজারে দরপতনের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সম্ভাব্য লেনদেন নিয়ে কিছুটা আশাবাদ দেখা গেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামও বেড়েছে। সরকারি বন্ডের মুনাফার হার কমার প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের দাম ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৮১ ডলারে পৌঁছায়। অনিশ্চয়তার সময়ে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণ ও সরকারি বন্ডের মতো সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করছে অর্থনৈতিক তথ্য, সুদের হার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
বিশ্লেষকদের জন্য আগামী কয়েক দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফল, এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা এবং জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন। এসব বিষয়ে নতুন তথ্য বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বদলে দিতে পারে। তবে এশিয়ার শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক দরপতনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আয়, বিনিয়োগের সুফল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
তথ্যসূত্র:Reuters, ১৯ অক্টোবর ২০২৬—বিশ্ববাজার ও এশিয়ার শেয়ারবাজারবিষয়ক প্রতিবেদন।
JhuleKa Kanoon Juli